দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান

ভূমিকা -:সভ্যতার অগ্রগতিতে বিজ্ঞান-বিজ্ঞাননির্ভর বর্তমান জীবন-শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান- চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান-অবসর বিনোদনে বিজ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্যাংসাত্মক ভূমিকা- উপসংহার।

  • ভূমিকা: আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভরতার যুগে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে কর্মজীবন সর্বত্রই বিজ্ঞানের আলোকদিশারি শক্তির আনাগোনা। মানবসভ্যতার প্রথম স্তর থেকে জীবনযাপনের রসদ সংগ্রহের জন্যই হোক কিংবা সভ্যতার পদচুম্বনের জন্য হোক বিজ্ঞানের জয়যাত্রা সর্বত্রই। বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রকৃতির নানা বস্তুকে নিজের প্রয়োজনীয় দ্রব্যে পরিণত করার প্রয়াসেই বিজ্ঞানের আবিষ্কার হয়। তাই পরবর্তীকালে বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতির হাত ধরেই মানুষের দৈনন্দিন জীবন আজ সুখসমৃদ্ধির চরম শিখরে উন্নীত হয়েছে।
  • সভ্যতার অগ্রগতিতে বিজ্ঞান:
    অসহায় বনবাসী মানুষ একদিন জীবনযাপনে নিশ্চয়তা বিধানের জন্য যে বিজ্ঞানের দ্বারস্য হয় সেই বিজ্ঞানেরই সহায়তায় তারা পরবর্তীকালে বন্ধ্যা প্রকৃতির বুকে ফসলের ফরমান বয়ে আনে। বিজ্ঞানের কল্যাণে সভাতা ও জীবনযাত্রার দ্রুত মানোন্নয়নের মাধ্যমে পরিবর্তনশীলতার ধারা অক্ষুন্ন রেখে সভ্যতার অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হয়েছে মানবকূল। আর সেই সঙ্গে জীবনযাপনের মানোন্নয়নের জন্য নিত্যনতুন উপকরণও উদ্ভূত হচ্ছে মানুষ ও বিজ্ঞানের যুগ্ম প্রয়াসে।
  • বিজ্ঞাননির্ভর বর্তমান জীবন:
    আমাদের দৈনন্দিন জীবন সর্বতোভাবেই বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল- প্রতিদিনের প্রতিটি ব্যবহার্য সামগ্রীই বিজ্ঞানের প্রসাদ। গ্রীষ্মকালীন কষ্ট লাঘবের জন্য ব্যবহৃত পাখা কিংবা এয়ার-কন্ডিশনারের মতো সামগ্রী, বৈদ্যুতিক আলো, শীতে উত্তাপ প্রদায়ী মেশিন, কর্মজীবনে ব্যবহারযোগ্য ঘড়ি। জুতো-কলম-পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যবস্তু সংরক্ষণযোগ্য ফ্রিজ, গ্যাসের উনুন কিংবা মাইক্রোওভেন, ব্যবসায়ী ও ছাত্রদের সুবিধার জন্য আবিষ্কৃত হিসাবযন্ত্র, গণকযন্ত্র, বৈদ্যুতিক লিফট, গাড়ি চালানোর সুবিধার্থে স্বয়ংক্রিয় নির্দেশব্যবস্থা, যোগাযোগ ও বিনোদনের মাধ্যমসমূহ প্রভৃতি যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ্যপ্রদায়ী বস্তুসামগ্রী বিজ্ঞানেরই দানভান্ডার থেকে লক্ষ।
  • শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান:
    শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নের জন্যও আমরা বিজ্ঞানের কাছে ঋণী। শুবৈদিক যুগে যে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল শ্রুতিনির্ভর বিজ্ঞানের কল্যাণে সেই শিক্ষাব্যবস্থারই উন্নয়ন ঘটে যখন ছাপাখানা আবিষ্কৃত হয়। পরবর্তীকালে কলমের ধরনধারণ থেকে শুরু করে রদবদল ঘটেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির গঠন ও অবস্থানে। আবার, আধুনিক কালে ডিজিট্যাল পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের রীতিরও প্রসার ঘটছে বিজ্ঞানেরই আশীর্বাদে।
  • চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান:
    চিকিৎসাবিজ্ঞানের দ্রুত উন্নয়ন বর্তমানে অসম্ভাব্যতার আড়ালে লুক্কায়িত সম্ভাব্যতারও প্রসার ঘটাচ্ছে। বিজ্ঞানের সদর্থক ভূমিকায় ক্যানসার ও টিউমারের মতো মারণব্যাধিও হয়ে উঠছে নিরাময়যোগ্য। দৃষ্টি ফিরে পাচ্ছে দৃষ্টিহীন, বধির লাভ করছে শ্রবণশক্তি, হৃদ্রোগীর হৃদযন্ত্রে কৃত্রিম সঞ্চালক স্থাপনের মাধ্যমে শল্যচিকিৎসকগণ অসাধ্যসাধনে সক্ষম।
  • অবসর বিনোদনে বিজ্ঞান:
    মানুষের সাধারণ জৈবজীবনের ঊর্ধ্বে একটি তাৎপর্যময় জীবন আছে, যাকে লালন করার জন্য বিজ্ঞান দিয়েছে বেতার, দূরদর্শন, চলচ্চিত্রের মতো বিনোদনের উপকরণ। কর্মক্লান্ত মানুষ তার কর্মব্যস্ত দিনের অস্তিমপর্বে এই সকল উপকরণগুলির কল্যাণে অবসর বিনোদনের সুযোগ পায়, মুক্তি পায় একঘেয়ে জীবনের অবসাদ থেকে।
  • বিজ্ঞানের ধ্বংসাত্মক ভূমিকা:
    একদা যে বিজ্ঞানের জন্ম হয় প্রকৃতির বন্য রূপ থেকে ভয়মুক্তির জন্য, বর্তমানে সেই বিজ্ঞানপ্রযুক্তির দাক্ষিণ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে মানবসভ্যতা। জীবন বিধ্বংসী ভেজাল খাদ্য ও ওষুধ, শক্তিমান রাষ্ট্রগুলির ব্যবহৃত অত্যাধুনিক মারণযন্ত্র বিশ্ববাসীকে করে তুলছে সন্ত্রস্ত। শুধু সামগ্রিক পৃথিবীই নয় ব্যক্তিজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিজ্ঞানের দ্বারা। যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হতে গিয়ে মানুষ যন্ত্রশক্তির দাসে পরিণত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে তাদের শারীরিক শ্রম দানের ক্ষমতা।
  • উপসংহার:
    বিজ্ঞানের সার্থকতা মানুষের কল্যাণে। তাই বিজ্ঞানকে কল্যাণ শ্রীমণ্ডিত করে তুলতে হবে। উচ্চনীচ ভেদে সকলের মধ্যে বিজ্ঞানের কল্যাণপূত আশীর্বাদ ছড়িয়ে দিয়ে, অতিযান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত হতে পারলে তবেই আমরা ‘যন্ত্রমানব’ নয় প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠে বিজ্ঞানদেবকে সর্বাঙ্গীণভাবে ব্যাবহারিক সার্থকতা প্রদান করতে পারব। আসলে অমৃতের স্পর্শ দান যেদিন বিজ্ঞানের প্রধান সত্য হয়ে উঠবে সেই দিনই বিজ্ঞানের শক্তি মানুষকে প্রকৃত অর্থে অমর করবে।

Leave a Comment